মামুনুর রশীদ নোমানী, বরিশাল :
বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সুসংগঠিত টেন্ডার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় এসেছে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার পরিবার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে আসছে বিস্ময়কর তথ্য—যেখানে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পিপলাই পরিবার, যারা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই টেন্ডারে অংশ নিয়ে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করত এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করত।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রায় দেড় দশক ধরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সরঞ্জাম সরবরাহের টেন্ডার কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতেন সত্য কৃষ্ণ পিপলাই এবং তার ছেলে সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই।
অভিযোগ রয়েছে, তারা—
নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই দরপত্রে অংশ নিতেন
প্রতিযোগিতার ভান তৈরি করতে কাছাকাছি দর জমা দিতেন
নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতেন
কম দামে ক্রয় করে বেশি দামে বিল উত্তোলন করতেন
একজন সাবেক হাসপাতাল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। বাইরে থেকে প্রতিযোগিতা মনে হলেও ভেতরে সবই নিয়ন্ত্রিত ছিল।”
গত বছরের ২৬ নভেম্বর ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের একটি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে—
তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আহমেদ
শিপ্রা রানী পিপলাই
সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই
সত্য কৃষ্ণ পিপলাই
দুদকের অভিযোগ, হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
একজন দুদক কর্মকর্তা বলেন,
“এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি দুর্নীতির নেটওয়ার্কের অংশ।”
২০২৩–২৪ অর্থবছরে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
তদন্তে দেখা গেছে—
চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও তিনটি একই পরিবারের
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: আহসান ব্রাদার্স, পিপলাই এন্টারপ্রাইজ, বাপ্পী ইন্টারন্যাশনাল
তিনটির ঠিকানাও একই
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল “কৃত্রিম প্রতিযোগিতা” তৈরি করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।
বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্রায় ৪ কোটি টাকার টেন্ডারেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে—
২৪টি টেন্ডার ফরম বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ২টি
উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিক একই পরিবারের সদস্য
দরপত্রে এমন শর্ত যুক্ত করা হয়, যা অন্যদের অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব করে তোলে
একজন স্থানীয় ঠিকাদার অভিযোগ করেন,
“শর্তগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না।”
সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—
ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহে ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা
এমএসআর সামগ্রীতে ৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা
মোট উত্তোলন: প্রায় ১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা
তদন্তে দেখা গেছে—
দরপত্রে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে
অযোগ্য ঘোষিত প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রপাতি এনে বেশি দামে সরবরাহ
একজন নিরীক্ষক বলেন,
“যদি প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকত, সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হতো।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
নিম্নমানের যন্ত্রপাতির কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হয়
হাসপাতালের সেবার মান কমে যায়
রোগীদের ভোগান্তি বাড়ে
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন,
“এই দুর্নীতি শুধু অর্থের ক্ষতি নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত।”
তদন্তে উঠে এসেছে, পিপলাই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে একাধিক লাইসেন্স ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—
পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার
প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব
স্থানীয় সূত্র বলছে, এই প্রভাবের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নিতেই ভয় পেত।
দুদক জানিয়েছে, চলমান তদন্তে আরও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে নতুন মামলা দায়ের করা হবে।
একজন কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা ধাপে ধাপে পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচন করার চেষ্টা করছি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে পারে।
বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোতে টেন্ডার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দুর্নীতির অভিযোগ কেবল একটি পরিবারের বিরুদ্ধে নয়—এটি একটি বৃহত্তর ব্যবস্থাগত সমস্যার প্রতিফলন।
প্রশ্ন উঠছে—
রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের এই চক্র ভাঙতে কতটা কার্যকর হবে তদন্ত?
আর এর জবাবদিহি আদৌ নিশ্চিত করা যাবে কি?